বিম্বিসার ছিলেন মগধ রাজ্যের বিখ্যাত রাজা। গৌতম বুদ্ধের সময়ে যে ষোলটি জনপদ বা রাজ্যের কথা জানা যায়, তার মধ্যে মগধ খুবই শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধিশালী রাজ্য ছিল। মগধের রাজধানী ছিল রাজগৃহ। বর্তমানকালের ভারতের বিহার রাজ্যই ছিল মগধ রাজ্য। এই রাজ্যের মাটি উর্বর ছিল এবং প্রচুর ফসল হতো। এ রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে হিরণ্যবতী বা শোন নদী।
বিম্বিসার ছিলেন হর্ষঙ্ক বংশের খ্যাতিমান নৃপতি। তাঁর নামের সাথে 'শেণিয়' বা 'শ্রেণিক' বিশেষণ যুক্ত হয়ে তিনি 'মগধরাজ শ্রেণিক বিম্বিসার' নামে খ্যাত ছিলেন। এটি ছিল তাঁর বংশের উপাধিবিশেষ। রাজা বিম্বিসারের রাজ্যাভিষেকের সঠিক সময় জানা যায় না। ধারণা করা হয় যে, গৌতম বুদ্ধের পরিনির্বাণের আনুমানিক ষাট বছর আগে তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়েছিল। বিম্বিসারের রাজত্বকাল থেকেই মগধের অগ্রগতির ইতিহাস শুরু হয়েছিল।
বিম্বিসারের জীবনকথা
বিম্বিসারের পিতার নাম ছিল ভট্টিয় বা মহাপদ্ম। অঙ্গরাজ্যের রাজা ব্রহ্মদত্ত একদা বিম্বিসারের পিতা রাজা মহাপদ্মকে পরাজিত করেছিলেন। বিম্বিসার পনেরো বছর বয়সে রাজা হন। রাজা হয়ে তিনি রাজা ব্রহ্মদত্তকে পরাজিত করে অঙ্গরাজ্য দখল করে নেন। তার পর থেকে মগধ রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। রাজা বিম্বিসার অত্যন্ত প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। যুদ্ধবিদ্যায় তাঁর সৈন্যবাহিনী খুব পারদর্শী ছিল। যুদ্ধে তিনি হাতি ব্যবহার করতেন। ফলে তিনি সহজেই যুদ্ধে জয়লাভ করতেন। তাঁর রাজ্যসীমা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। জানা যায়, তাঁর রাজ্যে আশি হাজার শহর ছিল। শহরগুলোর মধ্যে তিনি সুন্দর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। কোশল রাজ্যের রাজকুমারীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তিনি কোশল, বৈশালী, গান্ধার, অবন্তী প্রভৃতি রাজ্যের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপন করেন। রাজা বিম্বিসার প্রাচীন রাজগৃহ নগরী নির্মাণ করেছিলেন। রাজগৃহ পাঁচটি পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত ছিল। এখানে ছিল তাঁর রাজপ্রাসাদ। রাজপ্রাসাদের চারদিক পাথরের প্রাচীর দ্বারা ঘেরা ছিল। রাজগৃহে বুদ্ধ অনেক দিন বসবাস করেছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক ধর্মোপদেশ দান করেছিলেন। এখানে প্রথম ত্রিপিটক সংকলিত হয়েছিল। এ নগরীর ধ্বংসাবশেষ এখনও আছে। রাজগৃহের নিকটেই অবস্থিত ছিল নালন্দা।
রাজা বিম্বিসার সুশাসক ছিলেন। তিনি ন্যায়ের সঙ্গে রাজ্য শাসন করতেন। প্রজাদের খুব ভালোবাসতেন। সব সময় প্রজাদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করতেন। বিম্বিসারের জীবিতকালেই তাঁর পুত্র অজাতশত্রু রাজা হন। পরে দেবদত্তের প্ররোচনায় অজাতশত্রু পিতৃবিরোধী হয়ে ওঠেন। একসময় তিনি পিতাকে কারারুদ্ধ করেন। তাঁকে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দেন। বিম্বিসার কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল পয়ষট্টি বছর।
রাজা বিম্বিসার অন্য রাজ্যের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন শান্তিপ্রিয় রাজা ও উত্তম সংগঠক। পার্শ্ববর্তী অন্য রাজ্যের রাজারাও তাঁর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছিলেন। গান্ধারের রাজা পুকুরসাতি তাঁর কাছে দূত পাঠিয়েছিলেন। অবন্তীরাজ প্রদ্যোতের চিকিৎসার জন্য তিনি তাঁর চিকিৎসক জীবককে প্রেরণ করেছিলেন। জীবক ছিলেন তদানীন্তন ভারতবর্ষের একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক।
রাজা বিম্বিসারের রাজ্যে জৈনধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম উভয়েই সমসাময়িককালে বিকাশ লাভ করেছিল। মহাবীর জৈন, গৌতমবুদ্ধ এবং রাজা বিম্বিসার প্রায় সমকালীন ব্যক্তিত্ব। রাজা বিম্বিসার বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেও জৈনধর্মসহ সে সময়ে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তিনি নিয়মিত রাজ্য পরিদর্শন করতেন। গ্রামের শাসক গ্রামিকদের সাথে তিনি সব সময় মতবিনিময় করতেন। কথিত আছে, তিনি আশি হাজার গ্রামিকের ওপর ভিত্তি করে রাজ্য পরিচালনা করতেন। রাজ্যের রাস্তা ঘাট ও বাঁধ নির্মাণ এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তৈরিতে তিনি সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন।
অনুশীলনমূলক কাজ |